ঃইসলামের শান্তি ও সৌহার্দ্রপুর্ণ শিক্ষাঃ
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকার একজন কলামিস্ট লিখেছেন এবং একজন অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিবিদও বলেছেন যে, ইসলামী শিক্ষায় জিহাদ এবং অন্যান্য যেসব নির্দেশাবলী রয়েছে এই কারণেই মুসলমানরা উগ্রপন্থী হয়ে উঠছে। ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের শাসক শ্রেণীর একজন রাজনীতিবিদও একই কথা বলেছেন যে, ইসলামে কিছু কিছু উগ্রতামূলক বা কঠোরতার শিক্ষা তো অবশ্যই রয়েছে যার কারণে মুসলমানরা আজ উগ্রতা বা উগ্র পন্থার প্রতি আকৃষ্ট। আজকাল ইসলামের নামে ইরাক এবং সিরিয়ায় যে উগ্রপন্থী শ্রেণী কিছু অঞ্চল দখল করে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে তারা শুধু পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সরকারকে হুমকি ধমকীই দেয়নি বরং নির্দয় এবং অন্যায় হামলা করে সেখানে প্রাণহানি ঘটিয়েছে যার কথা আমি গত খুতবায় উল্লেখ করেছি। এ বিষয়টি যেখানে সাধারণ মানুষকে ভীত ত্রস্ত করে তুলেছে সেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কতক নেত্রীবৃন্দকে তাদের অজ্ঞতার কারণে বা ইসলাম বিরোধী দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে ইসলাম সম্পর্কে মুখ খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। বক্তারা এবং লেখকরা এই কথা লেখে এবং বলে যে, নিঃসন্দেহে অন্যান্য ধর্মের শিক্ষায়ও কিছু কঠোরতা সংক্রান্ত আদেশ-নিষেধ বা শিক্ষা রয়েছে কিন্তু সেসব ধর্মের মান্যকারীরা হয়তো তা মেনে চলে না বা পরিস্থিতি অনুসারে তাতে পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটিয়েছে আর তাদের শিক্ষাকে যুগের প্রয়োজন সম্মত করে তুলেছে। তিনি এ কথার ওপর জোর দিচ্ছেন যে, কুরআনেও এ যুগের চাহিদা অনুসারে এর শিক্ষায় পরিবর্তন আনা উচিত। যাহোক এতে অন্তত পক্ষে এই কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, তার কথা অনুসারে এদের শিক্ষা আর খোদার শিক্ষা রইল না বরং তা মানুষের বানানো শিক্ষা। আর এমনই হওয়ার ছিল কেননা এসব শিক্ষা স্থায়ী হওয়ার বা কিয়ামত পর্যন্ত এইগুলোর অনুসরনকারী জন্ম নেয়া সংক্রান্ত খোদা তা’লার কোন প্রতিশ্রুতি নেই কিন্তু কুরআনে, যেখানে আল্লাহ্ তা’লা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
অর্থ: এই যিকর অর্থাৎ এই কুরআনকে আমরাই নাযেল করেছি আর আমরাই এর সুরক্ষা করবো (সূরা হিজর-০৯)। আল্লাহ্ তা’লা এর সুরক্ষা বা হিফাযতের এই উক্তির পাশাপাশি ব্যবস্থাও হাতে নিয়েছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গ্রন্থে এই আয়াতের তফসীর করেছেন।
এক জায়গায় তিনি বলেন, আদি থেকে আল্লাহ্ তা’লার এই রীতি চলে আসছে যে, তিনি যখন কোন জাতিকে কোন কাজ থেকে বারণ করেন সেক্ষেত্রে অবধারিতভাবে তাঁর যে অদৃষ্ট হয়ে থাকে তাহলো তাদের কতক সেই অপকর্ম করবে, যেভাবে তওরাতে তিনি ইহুদীদের বারণ করেছিলেন যে, তোমরা তওরাত এবং অন্যান্য ঐশী গ্রন্থে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা প্রক্ষেপন করবে না। কিন্তু তাদের কতক তাতে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা প্রক্ষেপন করেছে। কিন্তু কুরআনে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, তোমরা কুরআনে প্রক্ষেপন করবে না বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করবে না বরং এটি বলা হয়েছে যে,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
এরপর তিনি (আ.) বলেন, এই আয়াত পরিষ্কারভাবে বলছে যে, যখন এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা এই শিক্ষাকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ করতে চাইবে তখন খোদা তা’লা ঊর্ধ্বলোক থেকে তাঁর কোন প্রেরীতের মাধ্যমে এর হিফাযত এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন। তো বিভিন্ন সময় কুরআনী শিক্ষার ওপর আপত্তি করে এরা এর শিক্ষাকে মিটিয়ে দিতে চায় কেননা তাদের নিজেদের শিক্ষা হয়তো মিটে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে বা শুধু গ্রন্থের আকারে রয়ে গেছে। আজকাল মেসেজ আদান প্রদানের বিভিন্ন রীতি রয়েছে যেমন টুইট করা হয়, হোয়াট্স এ্যাপ করা হয়। হোয়াট্স এ্যাপ ইত্যাদি সংক্রান্ত একটি ছোট স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রামাণ্য দেখানো হচ্ছিল, তাতে দুই ছেলে একটি বই যার বাহিরে লেখা ছিল কুরআন তা থেকে মানুষকে কিছু আয়াত বা আয়াতের অংশ পাঠ করে শুনাচ্ছে যে, এগুলো কেমন শিক্ষা আর রাস্তায় তারা এগুলো সম্পর্কে বিভিন্ন মানুষকে জিজ্ঞাসা করছিল এবং তাদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিল। তো বাইরে লেখা ছিল যে, এটি কুরআন বা কুরআন সংক্রান্ত বই আর তাদের সকলেই ইসলামী শিক্ষার সমালোচনা করছিল যে, দেখ প্রমাণ হয়ে গেছে, ইসলামী শিক্ষাই এমন যে কারণে মুসলমানরা এমন অপকর্ম করে থাকে। কিছুক্ষন পরেই এই ছেলেরা সেই গ্রন্থের মলাট খুলে ফেলে এবং দেখায় যে, এটি ইসলামী নয় বরং বাইবেলের শিক্ষা এবং বলে যে, আমরা আসলে বাইবেল পড়ছিলাম। এতে কেউ আর কোন নেতিবাচক মন্তব্য করেনি। ইসলামের নাম আসলে তাৎক্ষনিকভাবে সমালোচনামূলক মন্তব্য করে কিন্তু তখন তারা হেসে চুপ হয়ে যায়। পুরুষ মহিলা সকলেই চুপ হয়ে যায় আর একজন মহিলা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে যে, আশ্চর্যের বিষয়, আমি তো খ্রিস্টান স্কুলে পড়ালেখা করেছি, বাইবেলও পড়েছি। আমি তো কখনো এটি ভাবিইনি। তো এই হলো এদের স্বরূপ। কোন মুসলমান যদি অপকর্ম করে সেটিকে তারা ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করে কিন্তু যদি অন্য ধর্মের কেউ এমন করে তাহলে তারা বলে যে, এই বেচারা প্রতিবন্ধি বা এটি তার সীমাবদ্ধতা, সে পাগল। আমরা মানি এবং জানি যে, ইসলাম সম্পর্কে কতক মুসলমান গোষ্ঠির ভ্রান্ত আচরণ এই ধর্মকে দুর্নাম করে রেখেছে কিন্তু এর জন্য কুরআনী শিক্ষাকে আক্রমনের লক্ষ্যে পরিণত করা আর এই ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের হৃদয়ের হিংসা এবং বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এর এক চরম বহিঃপ্রকাশ হলো, আজকাল আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর ইসলাম এবং মুসলমানের বিরুদ্ধে মুখ খোলা।
যাহোক ইসলাম সম্পর্কে এরা যা ইচ্ছা বলতে পারে। কিন্তু ইসলামের অনিন্দ সুন্দর শিক্ষার মোকাবেলা কোন ধর্মীয় শিক্ষাও করতে পারবে না আর তাদের নিজেদের বানানো কোন আইনও করতে পারে না। তারা পরিস্থিতি অনুসারে যেভাবে নিজেদের আইনে পরিবর্তন আনে সেটি একান্ত তাদের নিজস্ব। কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা এ যুগেও স্বীয় প্রতিশ্রুতি অনুসারে কুরআনের সুরক্ষার জন্য এক মনোনীত মহা পুরুষকে পাঠিয়েছেন। যিনি ইসলামের দৃষ্টি নন্দন শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক জায়গায় আমাদের বলেন,
কুরআন করীম, যার দ্বিতীয় নাম হলো যিকর বা স্মরনিকা, সেই প্রারম্ভিক যুগে মানুষের অন্তর্নিহিত এবং বিস্মৃত সত্য এবং প্রচ্ছন্ন বিষয়াদিকে স্মরণ করানোর জন্য এসেছিল। খোদার এই সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি অনুসারে যে, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (সূরা হিজর-১০)। এ যুগেও ঊর্ধ্বলোক থেকে এক শিক্ষক এসেছেন যিনি وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ (সূরা জুমুআ-৪) এর সত্যায়ন এবং প্রতিশ্রুত ব্যক্তি তিনিই এখন তোমাদের মাঝে কথা বলছেন।
পুনরায় তিনি বলেন, আল্লাহ্ তা’লা নিজেই إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুরআন এবং ইসলামের সুরক্ষার দায়িত্ব নেন এবং মুসলমানদের এই পরীক্ষা এবং নৈরাজ্যের মাঝে হাবুডুবু খেতে দেননি। তাই সৌভাগ্যবান তারা যারা এই জামাতকে মূল্যায়ন করে এবং এটি থেকে লাভবান হয় অর্থাৎ তাঁর জামাতভুক্ত হয়।
তিনি আরো বলেন, আল্লাহ্ তা’লা আপন প্রতিশ্রুতি অনুসারে কুরআনের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার জন্য চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, কুরআনের সাহয্য এবং সমর্থন আমাদের সাথে রয়েছে। এটি আজ অন্য কোন ধর্ম বা ধর্মের অনুসারীদের ভাগ্যে জোটেনি।
সুতরাং এই বিষয়গুলো যেখানে ইসলাম বিরোধীদের আপত্তির যথেষ্ঠ উত্তর আর এই কথা বলা যে, অন্যান্য ধর্ম যুগের দাবি অনুসারে নিজের মাঝে বা নিজের রূপ পরিবর্তন করেছে এটি এ কথার স্বীকারোক্তি যে, সেই সব ধর্ম প্রাণহীন। কিন্তু একই সাথে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই প্রতাপান্বিত বাণী মুসলমানদের জন্যও আমন্ত্রণ যে, প্রচার মাধ্যম এবং বিভিন্ন বক্তৃতার মাধ্যমে ইসলামের ওপর যে আক্রমন হচ্ছে তার খন্ডনের জন্য সেই ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক বন্ধন রচনা করে ইসলামের সুন্দর শিক্ষার মাহাত্ম্য তুলে ধরার মাধ্যমে এসব বিরোধীদের মুখ বন্ধ করুন যারা ইসলামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস এবং উগ্রতার অপবাদ আরোপ করে থাকে। যারা বা যেই গোষ্ঠি তরবারির বলে ইসলাম প্রচারের দাবি করে থাকে তারা সত্যিকার অর্থে ইসলাম বিরোধী শক্তির হাতের ক্রীড়নক। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের স্পষ্টভাবে অবহিত করেছেন যে, এই যুগ তরবারির জিহাদের যুগ নয়। আর তরবারির জিহাদের অনুমতি সেই বিশেষ পরিস্থিতির কারণে দেয়া হয়েছিল যা ইসলামের প্রাথমিক যুগে সৃষ্টি হয়েছিল অর্থাৎ তখন শত্রুরা ইসলামকে তরবারির বলে নিশ্চিহ করার স্বপ্ন দেখছিল। ইসলাম শান্তি এবং প্রেম প্রীতির শিক্ষায় পরিপূর্ণ অর্থাৎ কুরআন করীম এই শিক্ষায় পরিপূর্ণ।
সুতরাং বর্তমান যুগে এই শিক্ষা প্রচার করার প্রয়োজন রয়েছে। আর প্রত্যেক আহমদীর এই শিক্ষাকে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে, ব্যবহারিক জীবনে এটি মেনে চলার প্রয়োজন রয়েছে, আল্লাহ্ তা’লার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রয়োজন রয়েছে। কেবল তবেই আমরা আহমদী হওয়ার দায়িত্ব পালনে সক্ষম হব। আজ কেবল আমরা আহমদীরাই মুসলমান এবং অমুসলিম উভয় শ্রেণীকে এই সত্য সম্পর্কে অবহিত করতে পারি। যারা ইসলামের বিরুদ্ধে আপত্তি করে তারা অজ্ঞ। আর তাদেরকে তাদের অজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের অবহিত করতে হবে। ইসলামী শিক্ষা শান্তি এবং নিরাপত্তার শিক্ষা। কুরআনী শিক্ষার আলোকেই এই শিক্ষা পৃথিবীকে দেখাতে হবে, তাদেরকে বলতে হবে যে, তোমরা না জেনেই যে বলে বস ইসলামী শিক্ষায় উগ্রতা রয়েছে, এ কারণে মুসলমানরা উগ্রপন্থী হয়ে উঠেছে, এটি তোমাদের জ্ঞানহীনতা এবং অজ্ঞতা। আর মুসলমানদেরও বলতে হবে যে, পারস্পরিক হত্যা, খুন এবং দলাদলির মাধ্যমে তোমরা ইসলামকে দুর্নাম করছ। যদিও আমাদের কাছে খুব বেশী রিসোর্সেস বা উপায় উপকরণ নেই কিন্তু যতটা আমরা প্রেস বা মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে করতে পারি তা সব দেশে এবং সব শহরে আমাদের করতে হবে। এখন পৃথিবী বাসীকে ইসলামের প্রকৃত চিত্র দেখানো একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ্ তা’লার কৃপায় প্রায় সর্বত্র এদিকে জামাতের দৃষ্টি রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির দাবি হলো অনবরত এ সম্পর্কে প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করা। তাদের সাথে সম্পর্ক এবং যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের মাধ্যমে জনসাধারণকে এ সম্পর্কে অবগত করতে হবে। আল্লাহ্ তা’লার বিশেষ অনুগ্রহে আমেরিকায় তাদের অনেক যোগাযোগ রয়েছে। অন্যান্য দেশেও রয়েছে। এখানেও কিছু যোগাযোগ আছে এবং জার্মানীতেও রয়েছে। এখন এই যোগাযোগকে ব্যাপকতর করার প্রয়োজন রয়েছে।
সম্প্রতি এখানে ব্রিটিশ সংসদে গ্লাসগোর একজন এম পি ইসলামের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে জামাতে আহমদীয়ার প্রেক্ষাপটে অবহিত করেন এবং বলেন যে, ইসলামের শান্তি এবং নিরাপত্তাপূর্ণ শিক্ষা যারা মেনে চলে তারা হলো আহমদী। আমি গ্লাসগোতে তাদের এক শান্তি সম্মেলনে অর্থাৎ পিস সিম্পোযিয়ামে যোগ দিয়েছিলাম এবং তিনি এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তখনই সেখানে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা হোম সেক্রেটারী ছিলেন তিনি বলেন যে, আহমদীরা যে ইসলাম তুলে ধরে তা সত্যিই সেই শিক্ষা থেকে পৃথক যা উগ্রপন্থী মুসলমানরা তুলে ধরে। আর সত্যিকার অর্থে আহমদীরা শান্তিপ্রিয় নাগরিক। সত্যি কথা হলো আহমদীরা নতুন কোন শিক্ষা তুলে ধরে না বরং কুরআনী শিক্ষাই উপস্থাপন করে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর আমরা যদি নীরব হয়ে যাই তাহলে কিছুদিন পর মানুষ ভুলে যাবে যে, হ্যাঁ বৃটিশ সংসদে একটি প্রশ্ন উঠেছিল। এটিকে এখন সবসময় স্মৃতিপটে জাগ্রত রাখতে হবে যে, ইসলামী শিক্ষা কী। একবার প্রচার মাধ্যম হয়তো সংবাদ ছাপে এরপর তারা চুপ হয়ে যায়। কিন্তু উগ্রতামূলক কোন ঘটনা যদি ঘটে বা না ঘটলেও এর নামে যদি পত্রিকায় কোন শিরোনাম ছাপা হয় তখনই ইসলাম বিরোধীরা ইসলামের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সুযোগ পায়।
সম্প্রতি আমি যখন জাপান সফরে ছিলাম সেখানেও শিক্ষিত শ্রেণীর বহিঃপ্রকাশ এটিই ছিল বরং এক খ্রিস্টান পাদ্রীও বলেন যে, এই ইসলামী শিক্ষা যা আপনি কুরআনী শিক্ষার আলোকে তুলে ধরছেন, জাপানীদের এটি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার খুবই প্রয়োজন রয়েছে বরং পৃথিবীবাসীর এর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, এটি তখনই কল্যাণকর হবে যদি এই কথাকে এই অনুষ্ঠান পর্যন্তই সীমিত না রাখা হয় যাতে আপনি বক্তৃতা করছেন বরং এই শিক্ষা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার অবিরত চেষ্টা করুন। সুতরাং ন্যায় পরায়ণ অ-মুসলিমরাও বলছেন যে, নীরবে বা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না বরং অবিরত পৃথিবীর সামনে এই শিক্ষা যদি তুলে ধরেন বা তুলে ধরা অব্যাহত রাখেন তবেই লাভজনক হবে। এখন জাপান জামাতের কাজ হবে সঠিক পরিকল্পনা করে এই কথাকে জাগ্রত রাখুন। এখানেও অর্থাৎ যুক্তরাজ্যেও আর পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ইসলামের দৃষ্টি নন্দন শিক্ষায় জ্ঞান এবং বুৎপত্তি যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর মাধ্যমে লাভ হয়েছে সেটিকে প্রচার এবং প্রসার করুন। এই সুন্দর শিক্ষার সামনে কেউ দাঁড়াতেই পারে না। আর এসব কথা কুরআনী শিক্ষার আলোকে তিনি (আ.) আমাদের অবহিত করেছেন। জামাতের বই-পুস্তক এবং সাহিত্যেও তা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আল্লাহ্ তা’লা কুরআনে করীমের সঠিক তফসীর এবং ব্যাখ্যা করার জন্য বা তফসীর ও ব্যাখ্যা প্রচার এবং প্রসারের জন্য, এর সঠিক অর্থের প্রচার এবং প্রসারের জন্য এবং কুরআনের সুরক্ষা এবং হিফাযতের জন্য তিনি (আ.)-কে পাঠিয়েছেন যেভাবে তিনি নিজেই বলেছেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর রচনাবলী, তাঁর মালফুযাত এবং বক্তৃতায় যথাযথভাবে এই দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুতরাং এ যুগে কুরআনের হিফাযত এবং সুরক্ষার কাজ আল্লাহ্ তা’লা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছেন বা তাঁর হাতে সাধিত করেছেন আর প্রত্যেক আহমদীর এখন এটি দায়িত্ব যে, সব শ্রেণীর এবং সকল প্রকৃতির মানুষের কাছে এই বাণী পৌঁছানো। অতএব সর্বত্র এই বাণী পৌঁছানোর মাধ্যমে তাঁর হাতে বয়আতের সুবাদে অর্পিত দায়িত্ব পালন করুন। এখন আমি কিছু দৃষ্টান্ত আপনাদের সামনে তুলে ধরবো যা ইসলামী শিক্ষার সৌন্দর্য প্রকাশ করে। কুরআন শরীফে আল্লাহ্ তা’লা এক জায়গায় বলেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ অর্থাৎ ধর্মে কোন জোর জবরদস্তি নেই। (সূরা বাকারা-২৫৭)
এরপর বলেন, وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآمَنَ مَن فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ যদি আল্লাহ্ তা’লা নিজের ইচ্ছা চাপাতে চাইতেন তাহলে ভূপৃষ্ঠে যত মানুষ আছে সকলেই ঈমান আনতো। (সূরা ইউনুস-১০০) সুতরাং যেখানে আল্লাহ্ তা’লাও বাধ্য করেন না সেখানে তুমি কি মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করবে? হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এক জায়গায় বলেন যে, ইসলাম কখনো জোর জবরদস্তির শিক্ষা দেয়নি। রসূলে করীম (সা.)-কে আল্লাহ্ তা’লা বলেছেন যে, যদি আল্লাহ্ তা’লা চাইতেন তাহলে لَآمَنَ مَن فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا পৃথিবীতে যারাই আছে তাদের সকলেই ঈমান নিয়ে আসতো কিন্তু আল্লাহ্ তা’লা তা চাননি। তাই মহানবী (সা.)-এর বাসনা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, এই কাজ তুমি বললেই হবে না। সুতরাং এই কথা সব সময় দৃষ্টিগোচর রাখা চাই আর একমাত্র এই শিক্ষাই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যে, ইসলামে কোন জোর জবরদস্তি নেই। তিনি বলেন, ইসলাম কখনো জোর জবরদস্তির শিক্ষা দেয়নি। যদি কুরআন এবং সমস্ত হাদীসের গ্রন্থ এবং ইতিহাসের গ্রন্থাবলি মনোযোগ সহকারে দেখা হয় আর মানুষ যদি যথাসাধ্য প্রণিধানের সাথে পড়ে এবং বোঝার চেষ্টা করে তাহলে এত জ্ঞান অর্জিত হওয়ার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এই আপত্তি অত্যন্ত লজ্জাস্কর এবং ভিত্তিহীন একটি আপত্তি যে, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের শিক্ষা দিয়েছে আর এটি তাদের ধারণা যারা বিদ্বেষমুক্ত হয়ে কুরআন, হাদীস এবং ইসলামের নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি বরং মিথ্যা এবং অপবাদ আরোপকেই পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে এবং আমি জানি, সেই যুগ ঘনিয়ে আসছে যখন সততার সন্ধানী ও ভিখারীরা এই সম্পর্কে অবহিত হবে। আমরা কি সেই ধর্মকে জোর জবরদস্তি মূলক ধর্ম আখ্যা দিতে পারি যার ঐশী গ্রন্থ কুরআনে স্পষ্ট শিক্ষা রয়েছে যে, لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ অর্থাৎ জোর করে কাউকে ধর্মে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না, ধর্মের বিষয়ে জোর জবরদস্তি বৈধ নয়। আমরা সেই সম্মানিত রসূলকে জোর জবরদস্তির জন্য অভিযুক্ত করতে পারি কি যিনি তের বছর পর্যন্ত মক্কায় নিজের বন্ধুদের এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে, অনিষ্টের মোকাবেলা করবে না, ধৈর্য ধারণ কর আর শত্রুর দুস্কৃতি যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং ইসলাম ধর্মকে নিশ্চিহ করার জন্য সব জাতি যখন ষড়যন্ত্র করে তখন ঐশী আত্মাভিমানের দাবি ছিল যারা তরবারি হাতে নিয়েছে তাদেরকে তরবারির মাধ্যমেই হত্যা করা উচিত নতুবা কুরআনে কোথাও জোর জবরদস্তির শিক্ষা দেয়া হয়নি। যদি জোর জবরদস্তির শিক্ষা দেয়া হতো তাহলে আমাদের রসূল (সা.)-এর সাহাবীগণ জোর জবরদস্তি মূলক শিক্ষার কারণে পরীক্ষার সময় প্রকৃত বিশ্বাসীদের মতো নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে সক্ষম হতেন না। জোর জবরদস্তি বা বাহুবল যদি প্রয়োগ করা হয় তাহলে তারা কখনো আন্তরিকতার সাথে বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করতে পারে না। তিনি বলেন, আমাদের নেতা ও মনিব নবী (সা.)-এর সাহাবীদের বিশ্বস্ততা এমন একটি বিষয় যে, তা এখানে বিষদভাবে তুলে ধরার আমাদের প্রয়োজন নেই।
তিনি আরো বলেন, তিন প্রকার যুদ্ধের বাইরে কোন ইসলামী যুদ্ধ ছিল না। ইসলামে তিন ধরণের যুদ্ধ ছিল অর্থাৎ তিন ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রথমত প্রতিরক্ষামূলক বা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ অর্থাৎ কেউ আক্রমন করলে তখন অস্ত্র হাতে নেয়া বৈধ। দ্বিতীয়ত শাস্তি স্বরূপ অর্থাৎ হত্যার বিনিময়ে হত্যা অর্থাৎ কাউকে যদি শাস্তি দিতে হয়। অর্থাৎ কেউ আক্রমন করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে তখন শাস্তি স্বরূপ যুদ্ধ হোক বা শান্তির যুগ হোক এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বা শাস্তি দেয়া হয়েছে বা হত্যা করা হয়েছে। আর তৃতীয়ত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থাৎ আক্রমনকারীদের শক্তিকে ভূলুন্ঠিত করার জন্য যারা মুসলমান হওয়ার কারণে হত্যা করতো। এমন শত্রু যারা এই কারণে হত্যা করতো যে, তোমরা মুসলমান কেন হলে। তাদেরকে মুসলমান হওয়ার কারণে হত্যা করা হতো। এটি ধর্মীয় বিষয় অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তন করেছ তাই তোমাকে হত্যা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তা’লা বলেন যে, এরা মুসলমানদের হত্যা করছে তাই এদের বিরুদ্ধেও তরবারি হাতে নেয়া যেতে পারে। তিনি বলেন যে, এই তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোন কারণে তরবারি হাতে নেয়ার বা কঠোর ব্যবহারের অনুমতি নেই।
তিনি বলেন, কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, ধর্ম প্রচারের জন্য তরবারি হাতে নেবে না। অর্থাৎ ধর্মের অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য তুলে ধর আর উত্তম আদর্শের মাধ্যমে মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট কর। এ কথা মনে করো না যে, সূচনাতে বা ইসলামের প্রারম্ভেই তরবারি হাতে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেই তরবারি ধর্ম প্রচারের জন্য হাতে নেয়া হয়নি বরং শত্রুর আক্রমন থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য বা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তরবারি হাতে নেয়া হয়েছে। ধর্মের জন্য জোর জবরদস্তি প্রদর্শন এর উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি বলেন, এরা মুসলমান আখ্যায়িত হয়ে শুধু এতটুকুই জানে যে, ইসলামকে তরবারির মাধ্যমে প্রচার করা উচিত। তারা ইসলামের ব্যক্তিগত সৌন্দর্যকে স্বীকার করে না। আর তাদের বা এদের কার্যক্রম পশুর কাজের সাথে সামঞ্জস্য রাখে বরং এরা পশু। সুতরাং জোর জবরদস্তির ভিত্তিতে ইসলামভুক্ত না করার ঘোষণা আপত্তিকারীর আপত্তি খন্ডনের জন্য যথেষ্ঠ। যারা বিবেকবান এবং বুদ্ধিমান তারা জানে এবং বুঝে যে, ইসলামকে অনর্থক এবং অন্যায়ভাবে দুর্নাম করা হয়। যেভাবে আমি বলেছি যে, অনেক শিক্ষিত মানুষ এমনকি খ্রিস্টান পাদ্রীরাও স্বীকার করেছে যে, ইসলামের এই শান্তিপ্রিয় এবং শান্তিপূর্ণ শিক্ষার সবিশেষ বা অনেক বেশী প্রচার কর আর এর মাধ্যমে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই কথা পূর্ণতা লাভ করছে যে, মানুষ বলে যে, ইসলামী শিক্ষা প্রচার কর। তিনি বলেছেন যে, সততার সন্ধানী এবং ভিখারীরা এই অর্থ সম্পর্কে অবহিত হবে যখন তারা জানতে পারবে যে, মূল শিক্ষা কি কিন্তু একই সাথে তিনি (আ.) আমাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, ধর্মের অভ্যন্তরীন সৌন্দর্যকে তুলে ধর আর এটি তখনই সম্ভব যদি আমাদের নিজেদের জ্ঞান থাকে অতএব জ্ঞান বৃদ্ধি কর। তিনি বলেন, উত্তম আদর্শের মাধ্যমে তাদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট কর, উত্তম আদর্শ প্রদর্শন কর যেন তোমাদের দেখেই মানুষ ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়।
তাই সব আহমদীর অনেক বড় দায়িত্ব হলো ধর্মের অভ্যন্তরীন সৌন্দর্য তুলে ধরার জন্য কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা, এরপর নিজের উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা। আর এই জ্ঞান এবং কর্মগুণেই এ যুগে মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর দাসত্বের শৃঙ্খলে এসে কুরআন এবং ইসলামের সুরক্ষা বা হিফাযতের কাজে আমরা অবদান রাখতে পারি আর পৃথিবীবাসীকে বলতে পারি যে, যদি পৃথিবীতে সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে কুরআনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।
ইসলাম যারা গ্রহণ করে না, তাদের চিত্র পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় এভাবে অংকন করা হয়ছে যে, وَقَالُوا إِن نَّتَّبِعِ الْهُدَىٰ مَعَكَ نُتَخَطَّفْ مِنْ أَرْضِنَا তারা বলে, তোমার প্রতি যে হিদায়াত অবতীর্ণ হয়েছে আমরা যদি তার অনুসরণ করি তাহলে আমাদেরকে দেশ থেকে ছো মেরে নিয়ে যাওয়া হবে (সূরা কাসাস-৫৮)। তাই ইসলামী শিক্ষার বিরুদ্ধে আপত্তি এই কারণে করা হয় না যে, এটি অন্যায় এবং জোর-জবরদস্তির শিক্ষা দেয় বরং যারা গ্রহণ করে না তারা যে আপত্তি করছে এর কারণ হলো তারা বলে যে, তোমার শিক্ষা যা শান্তির শিক্ষা, যা নিরাপত্তার শিক্ষা, তা অনুসরণ করলে চতুর্পাশের বিভিন্ন জাতি আমাদের ধ্বংস করে দেবে। সুতরাং ইসলামী শিক্ষা বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার শিক্ষা, শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা মূলক শিক্ষা, প্রেম এবং ভালোবাসার বাণী প্রচার এবং প্রসারের শিক্ষা। কিছু মুসলমান গোষ্ঠি যদি এই শিক্ষা না মানে এটি তাদের দুর্ভাগ্য। কুরআন নিঃসন্দেহে মূল শব্দে তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে কিন্তু এর ওপর তাদের কোন আমল নেই, তারা এটি মেনে চলে না, কুরআন এবং কুরআনী শিক্ষার যে হিফাযত বা সুরক্ষা করা উচিত তার বা সেই হিফাযতের দায়িত্ব তারা পালন করছে না। এর সুরক্ষার দায়িত্ব তো মসীহ্ মওউদ (আ.) এবং তাঁর জামাতেরই পালন করতে হবে। জ্ঞান এবং কর্মের মাধ্যমে আমাদেরই পৃথিবীকে অবহিত করতে হবে যে, পৃথিবীর শান্তি এবং নিরাপত্তা ইসলামের পক্ষ থেকে হুমকির সম্মুখিন নয় বরং তাদের পক্ষ থেকে হুমকির সম্মুখিন যারা এর বিরুদ্ধে চলছে। মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর যে উদ্ধৃতি আমি পড়েছি তাতে তিনি বলেন, এরা যে ইসলামকে দুর্নাম করছে তারা আসলে মিথ্যা এবং অপবাদ আরোপ করছে আর তাদের এই মিথ্যা এবং অপবাদ পৃথিবীর শান্তি এবং নিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে। এরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, পৃথিবীতে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য নৈরাজ্য সৃষ্টি করে রেখেছে। মুসলমান দেশে যে সমস্ত নৈরাজ্য রয়েছে সেখানেও কিছু পরাশক্তির হাত রয়েছে। এখন পাশ্চাত্যের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তাদের নিজেদের মানুষই বলছে যে, মুসলমান দেশের এই উগ্রপন্থি দলগুলো আমাদের সরকারেরই সৃষ্ট যা আমরা ইরাক যুদ্ধের পর বা সিরিয়ার পরিস্থিতির ফলে সৃষ্টি করেছি বা জন্ম দিয়েছি। এই কথার কারণে আমি মুসলমান এবং যারা মুসলমান আখ্যায়িত হয়ে উগ্রতা এবং ইসলামী শিক্ষার ভ্রান্ত চিত্র তুলে ধরছে তাদেরকে নির্দোষ আখ্যায়িত করছি না বা নির্দোষ আখ্যা দিচ্ছি না কিন্তু এই অগ্নি প্রজ্জলিত করার ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর অবশ্যই হাত রয়েছে। ন্যায়বিচার না করার কারণেই এই সবকিছু হচ্ছে। এখন আর সেই যুগ নেই যে, কোন পরাশক্তি কোন বিবৃতি দিলেই পুরো পৃথিবী তা মাথা পেতে নিবে। বরং প্রচার মাধ্যমের সুবাদে সকল বিশ্লেষকের সেখানে পৌঁছা বা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পৌঁছানো সহজ সাধ্য হয়ে উঠেছে। এখনও এক দিকে উগ্রপন্থিদের নিশ্চিহ করার বুলি আওড়ানো হয়, তাদের ওপর বোমাবারি করা হয় আর অপর দিকে তাদের অস্ত্র সরবরাহকারী এবং ভ্রান্ত পথে অর্থ সরবরাহকারী বা আর্থিক ট্রানজেকশানকারীরদের জানা সত্ত্বেও অর্থাৎ যদিও তারা জানে যে, এই সবকিছু কিভাবে হচ্ছে তবুও তারা চোখ বন্ধ করে রখেছে।
সুতরাং পৃথিবীর শান্তি এবং নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে যারা ঠেলে দিচ্ছে তাদের মাঝে কেবল মুসলমান দলগুলোই নয় যারা ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি আচরণ করে এমনটি করছে বরং পৃথিবীর বড় বড় সরকারগুলোও রয়েছে, যারা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং পৃথিবীর শান্তি তাদের কাছে একটি গৌণ বিষয়। একজন সত্যিকার মুসলমান জানে যে, আল্লাহ্ তা’লা হলেন শান্তি। আল্লাহ্ তা’লা সৃষ্টির জন্য শান্তি এবং নিরাপত্তাই চান। আর সত্যিকার মুসলমানদের মাঝে সত্যিকার অর্থে কেবল আহমদীরাই এই কথার জ্ঞান এবং বুৎপত্তি রাখে যে, আল্লাহ্ তা’লা মানুষকে শান্তি প্রদান এবং পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কত শিক্ষা দিয়েছেন, কতটা পথের দিশা দিয়েছেন বা দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’লা কুরআন শরীফের এক জায়গায় বলেন,
وَقِيلِهِ يَا رَبِّ إِنَّ هَٰؤُلَاءِ قَوْمٌ لَّا يُؤْمِنُونَ فَاصْفَحْ عَنْهُمْ وَقُلْ سَلَامٌ ۚ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
অর্থাৎ আর সে যখন বললো, হে আমার প্রভু! এরা ঈমান আনছে না, তখন আল্লাহ্ তা’লা বলেন, তাদের উপেক্ষা কর আর এতটা বল যে, সালাম, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, এরা অচিরেই জানতে পারবে যে, ইসলামের সত্যিকার সত্য এবং বাস্তবতা কি। (সূরা যুখরুফ-৮৯,৯০)
তো এই হলো কুরআনী শিক্ষা। রসূলে করীম (সা.) যখন আল্লাহ্ তা’লার দিকে ডাকেন তখন শ্রোতারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। মহানবী (সা.) বলেন, হে আল্লাহ্! আমি এদেরকে শান্তি এবং নিরাপত্তার দিকে ডাকি আর এরা অস্বীকার করছে। এরা শুধু অস্বীকারই করছে না বরং এরা এমন জাতি যারা শুধু ঈমান না এনেই ক্ষান্ত দিচ্ছে না, শান্তির বাণীকে শুধু অবজ্ঞাই করছে না বরং তারা আমাকেও নিরাপত্তা দেয় না এবং মুসলমানদের শান্তিকেও পদদলিত করছে। আল্লাহ্ তা’লা বলছেন যে, فَاصْفَحْ عَنْهُمْ তুমি তাদের উপেক্ষা কর, তারা জানে না বা এরা নির্বোধ এরা বুঝে না, এরা রেগে যায়, ক্ষেপে যায়। তাদের কথা শুনে এটিই বল যে, আমি তোমাদের জন্য শান্তি নিয়ে এসেছি, আমার বার্তা হলো শান্তির বার্তা আর এই বাণীই আমি প্রচার করে যাব।
অতএব, মহানবী (সা.)-এর জন্য তো খোদার নির্দেশ এটিই ছিল, আল্লাহ্ তা’লা কুরআন শরীফে তাকে এই নির্দেশই দিয়েছেন যে, ইসলাম বিরোধীদের সকল সীমালঙ্ঘন দেখে এবং সহ্য করে যেন কেবল এই উত্তরই দেয় যে, আমি তোমাদের শান্তির বার্তাই দিয়ে থাকি এবং দিয়ে যাব যেন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য এটি নির্দেশ সেখানে সকল মুসলমানের জন্য এটি কত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তো আজকের পরিস্থিতিতে এভাবেই পয়গাম পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব। আমাদের কাজ হলো শান্তি এবং নিরাপত্তার বাণী প্রচার করা। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) যেভাবে বলেছেন, যদি ইসলামের পক্ষ থেকে কোন সময় তরবারি উঠানো হয়ে থাকে তা-ও নিরাপত্তামূলকভাবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, যুলুম এবং অন্যায় করার জন্য নয়। তাই প্রশ্নই উঠে না যে, কুরআন করীম কোন সময় বা কোন স্থানে এই নির্দেশ দিয়ে থাকবে যে, তোমাদের কথা যে মানবে না তার বিরুদ্ধে তোমরা তরবারি হাতে নাও, তাকে খ--বিখ- করে ফেল, টুকরো টুকরো করে ফেল। যদি কোন মুসলমান গোষ্ঠি এবং মুসলমান রাষ্ট্রপ্রধান বা নেতা তার কর্মের মাধ্যমে এর পরিপন্থি কোন পয়গাম দিতে চায় আর দাবি করে যে, আমরা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছি তার জানা উচিত যে, এটি সত্যিকার ইসলাম নয়, এগুলো এমন ব্যক্তির ব্যক্তিস্বার্থ যা তারা চরিতার্থ করতে চাচ্ছে বা পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থ যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মুসলমানদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে আবার তাদের ওপর অপবাদ আরোপ করে যে, ইসলামী শিক্ষাই এমন। একজন প্রকৃত মুসলমান এবং রহমান খোদার বান্দার যে পরিচয় আল্লাহ্ তা’লা বর্ণনা করেছেন তা হলো وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًاঅর্থাৎ যখন অজ্ঞরা তাদের সাথে ঝগড়া করে তারা বিবাদে লিপ্ত না হয়ে বলে যে, আমরা তোমাদের জন্য শান্তিরই দোয়া করি। (সূরা ফুরকান-৬৪)
সুতরাং এই হলো কুরআনী শিক্ষা, আর এ শিক্ষাই সর্বস্তরে শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শিক্ষা দেয়। অতএব আমাদের সকলের বিশেষ করে যুবক শ্রেণীর কোন প্রকার হীনমন্যতার স্বীকার হওয়ার প্রয়োজন নেই কেননা ইসলাম এবং একমাত্র ইসলামই পৃথিবীতে শান্তি এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে আর এটি অর্থাৎ কুরআন এবং কেবল কুরআনই শান্তি এবং নিরাপত্তার বিস্তার এবং উগ্রতার অবসানের শিক্ষা দিয়ে থাকে।
তাই এই শিক্ষার ব্যুৎপত্তি এবং জ্ঞান অর্জন সবার জন্য আবশ্যক, এই শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে শিরোধার্য করা প্রয়োজন। এই শিক্ষা অনুসরণ করুন, যেভাবে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, নিজেদের ব্যবহারিক দৃষ্টান্তের মাধ্যমে জগদ্বাসীকে অবহিত করুন যে, আজকে কুরআনের হিফাযতের জন্য আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে তৌফিক দিয়েছেন, এটি তাঁর কৃপা। কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা এর অর্থের সুরক্ষাও বটে। এর জন্য আল্লাহ্ তা’লা এই যুগে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে প্রেরণ করেছেন আর তিনি (আ.)-কে গ্রহণ করার তৌফিক দিয়ে এই কাজের জন্য আমাদেরও মনোনিত করেছেন এবং বেছে নিয়েছেন। সুতরাং এই শান্তির শিক্ষা পৃথিবীতে বিস্তারের কাজ করা সব আহমদীর দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য সকল আহমদী ছেলে-মেয়ে এবং নর-নারীর চেষ্টা করা উচিত। পৃথিবী এখন অগ্নি গহ্বরের যেই মুখের কাছে দাঁড়িয়ে আছে, যেকোন সময় পরিস্থিতি এমন মোড় নিতে পারে যে, তারা তাতে পড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীবাসীকে এই অগ্নিতে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষার চেষ্টা করা, শান্তি এবং নিরাপত্তা প্রদানের কাজ করা এক আহমদীর দায়িত্ব আর কেবল আহমদীরাই তা করতে পারে।
সুতরাং এর জন্য চেষ্টার প্রয়োজন আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আল্লাহ তা’লার সাথে বিশেষ সম্পর্ক বন্ধন রচনা করা, তাঁর সামনে বিনত হওয়া, তাঁর তাক্বওয়া অবলম্বন করা, হৃদয়ে তাঁর ভীতি এবং ভালোবাসা সৃষ্টি করা, কেবল তবেই আমরা নিজেদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এবং পৃথিবীবাসীকে শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারি। এমনই মুহুর্তের জন্য এমন পরিস্থিতিকে সামনে রেখে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন যে,
আগুন, সর্বত্র আগুন, কিন্তু সেই আগুন থেকে সেই সব লোকদের রক্ষা করা হবে যারা মহা বিস্ময়ের অধিকারী খোদাকে ভালোবাসে।
সুতরাং আমাদের এই বিস্ময়ের মালিক এবং সর্বশক্তিমান খোদার সাথে সম্পর্ক দৃঢ়তর করার প্রয়োজন রয়েছে। অতএব খোদা-প্রেম এবং ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতি করার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তা’লা আমাদের সবাইকে এর তৌফিক দিন আর দুনিয়ার কীটদেরও আল্লাহ্ তা’লা বিবেক বুদ্ধি দিন, তারা যেন খোদার ডাকে সাড়া দেয় এবং আত্মসংশোধনের চেষ্টা করে এবং ধ্বংসের গহ্বরে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
নামাযের পর একটি জানাযা হাযের এবং দু’টি গায়েবানা জানাযা পড়াব। জানাযা হাযের হলো জনাব এনায়েতউল্লাহ্ আহমদী সাহেবের যিনি ২০১৫ সনের ৯ই ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেছেন, ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিঊন। তিনি জামাতের মুবাল্লিগ ছিলেন, দীর্ঘকাল জামাতের মুবাল্লিগ হিসেবে কাজ করেছেন, তারা পিতার নাম হলো আল্লা বক্স সাহেব, যিনি কাদিয়ানের আল্লা বক্স টিম প্রেসের মালিক ছিলেন। এনায়েতুল্লাহ আহমদী সাহেব ১৯২০ সনের জানুয়ারী মাসে জন্ম গ্রহণ করেন। ৫ বছর বয়সে কাদিয়ান স্থানান্তরিত হন এবং কাদিয়ানের তালিমুল ইসলাম স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সনে কাদিয়ানের তালিমুল ইসলাম স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৯ সনে পূর্ব আফ্রিকায় মিলিটারিতে ভর্তি হোন আর ১৯৪৬ সনে জুলাইয়ে পাশ করেন। ২৪ বছর বয়সে ৩ শে মে ১৯৪৪ সনে জীবন উৎসর্গ করেন এবং ১৯৪৬ সনের জুলাই থেকে পূর্ব আফ্রিকায় মুবাল্লিগ হিসেবে কাজ আরম্ভ করেন। ১৯৭৯ সনের ডিসেম্বর মাসে ৬০ বছর বয়সে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত বহির্বিশ্বে মুবাল্লিগ হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। ৪ বছর ৪মাস কেনিয়াতে, ১৮ বছর ১১ মাস তানজানিয়ায় মুবাল্লিগ হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর অবসর নেয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে শিয়ালকোট এবং ঝাঙ্গ জেলায় মুরুব্বী জেলা হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তার সন্তান-সন্ততিদের মাঝে চার ছেলে এবং তিন মেয়ে রয়েছে। এক ছেলে জনাব হাবীবুল্লাহ্ আহমদী সাহেবেরও ওয়াক্ফ্ হিসেবে খিদমত করার বা কাজের সৌভাগ্য হয়েছে। এনায়েতুল্লাহ্ আহমদী সাহেব যখন তানজানিয়ায় ছিলেন, সেখানে কাজের গন্ডি প্রসারিত হওয়ার পর ১৯৪৭ সনে খলীফা সানী (রা.) জনাব মওলানা শেখ মুবারক আহমদ সাহেবকে সাহায্যের জন্য যে সকল মুবল্লিগ পাঠিয়েছিলেন তাদের মাঝে চৌধুরী এনায়েতুল্লাহ্ সাহেবও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সেখানে বিভিন্ন স্থানে জামাতের কাজ করেছেন। অনুরূপভাবে শেখ মুবারক সাহেব যখন পবিত্র কুরআনের সোহেলী ভাষায় অনুবাদ করছিলেন তখনও হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.) তার সাহায্যকারীদের মাঝে চৌধুরী এনায়েতুল্লাহ্ সাহেব এবং মওলানা জালাল উদ্দীন ক্বমর সাহেবকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এভাবে কুরআন করীমের সোহেলী ভাষায় অনুবাদের কাজ করারও সৌভাগ্য হয়েছে তার। তিনি দারুস সালামে ৩ বছর মুবাল্লিগ ইনচার্জ হিসেবে কাজ করারও সুযোগ পেয়েছেন।
একবার তিনি বাঙ্গালে জামাতের এক মসজিদে নামায পড়ানোর জন্য সাইকেলে যাচ্ছিলেন, পথে আহমদী বন্ধুরা বলে যে, গয়ের আহমদী ইমাম অন্যান্য লোকদের নিজের দলে ভিড়িয়েছে এবং তাদের মসজিদ জ্বালিয়ে মসজিদকে ধুলিস্যাৎ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তাই আপনি সেখানে যাবেন না। তিনি তখন বীরত্বের সাথে উত্তর দেন যে, আমি অবশ্যই যাব আর তার সফর অব্যাহত থাকে। যেভাবে বলেছি, সাইকেলে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে এক জায়গায় বাঙ্গালের চীফ-এর সাথে দেখা হয়। তিনি তাকে সাইকেলে দেখে ব্রেক করেন এবং বলেন যে, কারে বসুন। তিনি বলেন, আমি সাইকেলে যাচ্ছি এবং ঠিক আছি। যাহোক চীফের অনুরোধে তিনি কারে বসেন আর চীফ তাকে গ্রামে নিয়ে আসে। রাস্তায় চীফকে গ্রামের যে পরিস্থিতির সংবাদ তিনি পেয়েছেন সেই সংবাদ সম্পর্কে অবহিত করেন। তখন চীফ সবাইকে ডাক দেয় এবং বলে যে, ইনি আমাদের অতিথি আর অতিথিদের সাথে কেউ দুর্ব্যবহার করবে না আর এমনটি আমি করতে দিবও না। তার যা সাহায্য করা যায় আমি তা করবো। ইমামকে তিনি বকা-ঝকা করেন এবং বলেন যে, আমি তার পিছনে নামায পড়বো। এরপর নামাযের সময় হলে চীফ তার পিছনে তার ইমামতিতে নামায পড়েন। এলাকার লোকদের ওপর তার সুগভীর প্রভাব ছিল এবং তার যোগাযোগের গন্ডি ছিল ব্যাপক। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমের পদমর্যাদা উন্নীত করুন, তার প্রজন্মকে আর সন্তান-সন্ততিকে জামাত এবং খিলাফতের সাথে বিশ্বস্ততাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার তৌফিক দিন।
দ্বিতীয়টি হলো গায়েবানা জানাযা, যা কাদিয়ানের দরবেশ মৌলভী বশীর আহমদ সাহেবের জানাযা। ৮৭ বছর বয়সে গত ৭ই ডিসেম্বর তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন, ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিঊন। মৌলভী বশীর আহমদ সাহেব বদর সংখ্যায় আত্মজীবনীতে লিখেন যে, এই অধমের গ্রামের এক বন্ধু মোহাম্মদ আহমদ সাহেব কালা আফগানা কাদিয়ান আসেন। আমি ডেরা বাবা নানকে পরীক্ষা দিয়ে চাকুরীর সন্ধানে ছিলাম। জনাব মোহাম্মদ সাহেব পয়গাম পাঠান যে, আমি চুঙ্গির চাকুরী ছেড়ে আল ফযল অফিসে কাজ করতে চাই, তুমি আমার জায়গায় চুঙ্গিতে কাজে নিয়োজিত হও, তিনি তখন আহমদী ছিলেন না, এটি ১৯৪৬ সনের কথা। তিনি বলেন যে, আমি আমার গ্রাম থেকে কাদিয়ান স্থানান্তরিত হই আর চুঙ্গিতে চাকুরী আরম্ভ করি। এরপর যখন আমি কাদিয়ানে চাকুরীর জন্য আসি তখন আহমদীয়াতের শিক্ষা সম্পর্কে খুব একটা জানা ছিল না। তিনি বলেন, আমি এক অমুসলিম বন্ধুকে বলি যে, নামাযের জন্য এমন কোন মসজিদের সংবাদ দাও যা কাদিয়ানীদের মসজিদ হবে না, আহমদী মসজিদে আমি যেতে পারি না, সেই অমুসলিম আমাকে মসজিদে আক্বসার রাস্তা সম্পর্কে অবহিত করে, তিনি বলেন যে, আমি সেখানে গেলাম, অনেক বড় মসজিদ, কেউ নামায পড়ছে, কেউ তিলাওয়াত করছে, সুন্দর মিনার দেখতে পাই। আমি মনে মনে আনন্দিত হই যে, আমাদের মসজিদ তো খুবই ভালো, আমি এখন আর কাদিয়ানীদের মসজিদে যাব না। একদিন জানতে পারলাম যে, এটি আহমদীদেরই মসজিদ। তিনি বলেন, এরপর একদিন আহরারীদের মসজিদে যাই, সেখানকার অবস্থা দেখে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলাম যে, এখন সব সময় মসজিদে আক্বসাতেই নামায পড়বো। এরপর ধীরে ধীরে এক আহমদী বন্ধুর সাথে তার পরিচয় হয়, তিনি তাকে জামাতি বিষয়াদী সম্পর্কে অবহিত করেন এবং তবলীগে হিদায়াত ও অন্যান্য বই এবং পুস্তক-পুস্তিকা দেন। তিনি বলেন, এর ফলে এই অধম আহমদীয়াত গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করে। ১৯৪৭ সনে যখন দেশ বিভাগ হয় তখন হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.)-এর নির্দেশে খোদ্দাম দূর দূরান্ত থেকে কেন্দ্রের হিফাযতের জন্য আসে। তখন এই অধমও কেন্দ্রের সুরক্ষার জন্য নাম লেখায় যা গৃহিত হয় আর এভাবে আল্লাহ্ তা’লা দরবেশদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, বয়আতের পর আমার আত্মীয়স্বজন বিশেষ করে পিতা-মাতা ভয়াবহ বিরোধিতা করে। এরপর দেশ বিভাগের সময় তারা আমাকে বলে যে, আমাদের সাথে চলে আস, আহমদীয়াত গ্রহণের কারণে হাহুতাশ করে কিন্তু আমার অস্বীকারের পর আমার পিতা-মাতা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চেষ্টা করে কিন্তু আমি যাইনি। ধর্মকে জাগতিকতার ওপর প্রাধান্য দেই বরং তিনি বলেন যে, আমার এই দুঃখে আমার মায়ের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে যেতে থাকে। ১৯৫২ সনে হায়দ্রাবাদের জহুর উদ্দীন সাহেবের কন্যা মুক্তারুন নেসার সাথে তার বিয়ে হয়। তার ঔরশে তার দুই ছেলে, মাহমুদ আহমদ সাহেব এবং শোয়েব আহমদ সাহেব রয়েছে। শোয়েব সাহেব ওয়াকফে জিন্দেগী এবং নাযের বায়তুল মাল খরচ হিসেবে কাদিয়ানে কাজ করছেন। তার এক জামাতা ক্বারী নওয়াব সাহেবও ওয়াকফে জিন্দেগী। তিনি দেহাতী মোবাল্লিগ হিসেবে মহারাষ্ট্র কর্নাটকে কাজ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। মরহুমের তবলীগের সুগভীর আগ্রহ ছিল, কোন বোর্ডে বা শ্লেটে লিখে রাখতেন যে, ইমাম মাহদী (আ.) এসে গেছেন যেন মানুষ পড়তে পারে এবং এরপর তবলীগ আরম্ভ করে দিতেন। অনুরূপভাবে তার বিভিন্ন অফিসে কাজের সৌভাগ্য হয়েছে, বদর পত্রিকার ম্যানেজারও ছিলেন, লঙ্গর খানা এবং অন্যান্য স্থানেও কাজ করেছেন। বিভিন্ন বিভাগে এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে তার ব্যাপক যোগাযোগ ছিল, তারা তাকে সম্মান করতেন। বার্ধক্য সত্ত্বেও সব সময় মসজিদে এসে নামায পড়তেন। মৃত্যুর দিনও যোহর ও আসর নামায মসজিদে পড়েছেন। মসজিদে মোবারকের যে পুরনো অংশ ছিল বিশেষ করে সে অংশে দাড়িয়ে নামায পড়তেন। রুইয়া এবং কুশুফের অভিজ্ঞতাধারী ব্যক্তি ছিলেন, মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, প্রায় সময় নতুন ওয়াকফে জিন্দেগী যুবক শ্রেণী তার সাহচর্যে বসে অনেক কল্যাণ ম-িত হতেন। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমের পদ মর্যাদা উন্নীত করুন এবং তার সন্তান সন্ততিকে তার দোয়ার উত্তরাধিকারী করুন।
তৃতীয় জানাযা শ্রদ্ধেয়া সৈয়্যদা কান্তা সাহেবার, যিনি উড়িষ্যার অধিবাসীনী, আমাদের ওয়াকফে জিন্দেগী ডাক্তার তারেক আহমদ সাহেব যিনি এখন কাদিয়ানের নূর হাসপাতালের ইনচার্জ তার মাতা ছিলেন। তিনি গত ১৬ই অক্টোবর ইন্তেকাল করেন, ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিঊন। স্বল্পে তুষ্ট, সরল প্রকৃতির, ধৈর্যশীলা, দরিদ্রের লালনকারিনী এবং পূণ্যবতী মহিলা ছিলেন। নিজের সন্তান-সন্ততির উচ্চ শিক্ষা এবং ভালো তরবীয়তের প্রতি তার সুগভীর দৃষ্টি ছিল। তার স্বামী সরকারী চাকুরে ছিলেন, সীমিত আয় ছিল কিন্তু তাসত্ত্বেও নিজের দরিদ্র এবং সাহায্যের মুখাপেক্ষি আত্মীয়স্বজনের খিদমত করতেন বা সেবা করতেন আর এ ক্ষেত্রে কান্তা সাহেবার সার্বাত্মক সহযোগিতা ছিল, তিনি কখনো আপত্তি করেন নি বরং সব সময় উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ্ তা’লা মরহুমার পদমর্যাদা উন্নীত করুন, মাগফিরাত করুন এবং তার পুণ্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝেও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সঞ্চালিত হয়। (আমীন)
মন্তব্যসমূহ